অর্হৎরা কি সবকিছু জানতে পারে?


অর্হৎরা কি সবকিছু জানতে পারে?

লিখেছেন: জ্ঞানশান্ত ভিক্ষু

আমাদের অনেকেরই ধারণা যে, অর্হৎগণ সবকিছু জানেন। সুত্রপিটকের সংযুক্ত নিকায়ে এব্যাপারে বলা হয়েছে, “ভিক্ষুগণ, সবকিছু বিশেষভাবে জেনে, পরিপূর্ণভাবে জেনে তবেই দুঃখক্ষয় সম্ভব (স.নি.৪.২৬)”। এই কথার ভিত্তিতে অনেকেই মনে করতে পারে, অর্হৎগণ সবকিছু পরিপূর্ণভাবে জেনে তবেই অর্হৎ হন।

কিন্তু সবকিছু পরিপূর্ণভাবে জানাটা কী জিনিস? সেটা বুঝাতে গিয়ে সেই সুত্রে বুদ্ধ বলেছেন, “হে ভিক্ষুগণ, চোখ, রূপ, চোখবিজ্ঞান, চোখবিজ্ঞান দ্বারা জ্ঞাতব্য বিষয়গুলো … মন, মানসিক বিষয়, মনোবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান দ্বারা জ্ঞাতব্য বিষয়গুলো, এগুলোই হচ্ছে সেই বিষয়গুলো যেগুলোকে বিশেষভাবে জেনে, পরিপূর্ণভাবে জেনে দুঃখক্ষয় সম্ভব।”

অর্থাৎ সোজা কথায় নামরূপকে পরিপূর্ণভাবে জানতে পারলে তবেই দুঃখক্ষয় সম্ভব। তো এই নামরূপ কী জিনিস? সেটা হচ্ছে এই দেহ ও মন। এই দেহ ও মন কী এবং সেগুলো কীভাবে কাজ করে, কীভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানলে তবেই অর্হৎ হওয়া সম্ভব।

তাই অর্হৎগণ এই দেহমন ও তাদের কার্যপ্রক্রিয়া নিয়ে নিঃসংশয় হন। বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে নিঃসংশয় হন। কিন্তু বাদবাকি বিষয়গুলো জানা বা না জানা সেটা তাদের ত্রিপিটক শিক্ষা ও প্রজ্ঞার উপরে নির্ভর করে।

উদাহরণস্বরূপ ধর্মপদের পোট্ঠিল স্থবিরের কাহিনী ধরুন না। তিনি ত্রিপিটক শিক্ষা করে ধর্মকথিক হয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি ধ্যানসাধনা করার জন্য জঙ্গলে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত মহাথেরোকে বললেন, “ভান্তে, আমাকে আশ্রয় দিন।” সেখানে মহাথেরোসহ সবাই ছিলেন অর্হৎ। অথচ মহাথেরো বললেন, “বন্ধু, তুমি হলে গিয়ে ধর্মকথিক। তোমার কাছ থেকেই আমরা অনেক কিছু জানতে পারি।” কিন্তু পোট্ঠিল ছাড়লেন না। তখন ধর্মকথিকের মান ভাঙানোর জন্য মহাথেরো তাকে অন্যান্য ভিক্ষুদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। অন্য ভিক্ষুরাও একজন আরেকজনকে দেখিয়ে দিল। এভাবে অবশেষে তিনি এক সাত বছর বয়স্ক শ্রমণের কাছে গিয়ে বললেন, “হে সৎপুরুষ, আমার আশ্রয় হও।” শ্রমণ বলল, “আহা, আচার্য। কেন এমন কথা বলেন? আপনি তো অনেক সিনিয়র, বহুকিছু জানেন। বরং আপনার কাছেই আমার কিছু জানার থাকতে পারে।” এভাবে ত্রিপিটকের অনেক বিষয় অর্হতেরও অজানা থাকতে পারে, যেগুলো তারা ত্রিপিটকে অভিজ্ঞ ভিক্ষুদের কাছ থেকে জানতে পারে।

আচ্ছা, পোট্ঠিল স্থবিরের কথা না হয় বাদ দিলাম। মিলিন্দ প্রশ্নের শত কোটি অর্হতের কথা ধরুন না। অশ্বগুপ্ত ভান্তে যখন সেই অর্হৎদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, “বন্ধুগণ, কোনো দক্ষ ভিক্ষু কি আছেন যারা মিলিন্দ রাজার সাথে আলাপের মাধ্যমে তার সন্দেহ দূর করতে সক্ষম?” তিনবার জিজ্ঞেস করার পরেও শতকোটি অর্হৎ চুপ করে রইলেন (মি.প.৮)। যথাযথ ত্রিপিটক শিক্ষা ও তার সাথে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাবল না থাকলে এমনকি অর্হৎগণও পণ্ডিত ব্যক্তিদের প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হন না।

মাঝে মাঝে এমনও হয়, অর্হৎগণ জেনেও বলতে চান না, আবার কখনো কখনো সত্যিই জানেন না। উদাহরণস্বরূপ, ধর্মপদের চক্ষুপাল স্থবিরের কথা ধরুন। চক্ষুপাল স্থবির অর্হৎ হওয়ার সাথে সাথে অন্ধ হয়েছিলেন। তিনি যখন অন্ধ অবস্থায় পায়চারি করছিলেন, তখন মাটিতে অনেকগুলো লাল লাল পোকা তার পদতলে পিষ্ট হয়ে মারা গেল। অথচ তিনি সেটা জানলেনও না। এমন ছোটখাট আরো অনেক ঘটনার কথা বলা যায় যেখানে অর্হৎগণের লৌকিক বিষয়গুলো না জানার বিষয়টি ফুটে ওঠে।

কথাবত্থুতেও বলা হয়েছে, অর্হৎগণ অন্যের নাম-ঠিকানা নাও জানতে পারেন। পথ চলতে গিয়ে কোনটা ঠিক পথ, কোনটা ভুল পথ সেটা নাও জানতে পারেন। ঘাস, কাঠ ও গাছপালার কোনটা কী নাম সেগুলো নাও জানতে পারেন (কথাৰত্থু.৩২১-৩২২)।

সবকিছু নির্বিশেষে জানতে পারেন একমাত্র সর্বজ্ঞ বুদ্ধ। বুদ্ধ তার সর্বজ্ঞতা জ্ঞানে নিমেষেই সবকিছু জানতে পারেন। কিন্তু বুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোনো অর্হতের সেই সর্বজ্ঞতা জ্ঞান থাকে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো অর্হৎ যদি লৌকিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হন, তাহলে তিনি কি বলতে পারবেন, আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণটি কি? তিনি কি বলতে পারবেন, স্টীলের মধ্যে লোহা ও কার্বনের পার্সেন্টেজ কত? তিনি কি বলতে পারবেন, ফিবোনাচি সিকোয়েন্স কী জিনিস? তাই পারমার্থিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তারা জানবেন সেটা আমি স্বীকার করি, কিন্তু লৌকিক বিষয়গুলোর সবকিছু জানবেন এমন দাবির কোনো যৌক্তিকতা আমি দেখি না। এব্যাপারে আপনাদের মতামত জানার ইচ্ছে রইল।

No comments

Powered by Blogger.